স্মৃতির কার্নিশে: বোধ ও যাপনের রেখাচিত্র
মাসউদ আহমাদ
কবিতা হয়তো পাঠকের মস্তিষ্কে বা হৃদয়ে ধাক্কা দেয় না
সবসময়,
কিন্তু আমাদের চেনা জগৎই কবির চোখে ও হৃদয়ে অন্যভাবে অপরূপ বীভায়
উদ্ভাসিত হয়; সৃজনের অলৌকিক নির্যাস ও সৌন্দর্যে ধরা পড়ে
জীবনের টুকরো-সামান্য সুখ-দুঃখ মনোরম ও গভীরতম অনুভবে। এবং কবি নিজের কথাই বলে
চলেন আর সেই কথার অনুভব ও অভিঘাত সকলের একান্ত কথা হয়ে ওঠে প্রকাশভঙ্গিমায়,
ভাব ও বিষয়ের গভীরতর ব্যঞ্জনায়।
কবি শামস মনোয়ারের কবিতাগ্রন্থ স্মৃতির কার্ণিশে এবারের
একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। ৬৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থ নানারঙ ও গন্ধের ৪৪টি কবিতা
ধারণ করেছে। শামস মনোয়ারের কবিতার বিষয়গুলোকে আমরা এভাবে নিরূপণ করতে পারি সাম্প্রতিক সময় ও সমাজের বিচিত্র রঙ; মানবপ্রেম, দেশাত্মবোধ ও যুদ্ধাপরাধ প্রসঙ্গ,
মানুষের সরল সুন্দর সুখ-অসুখ, মনস্তাত্ত্বিক
জটিলতা, মনো-সামাজিক দ্রোহ, রাজনৈতিক
চেতনা এবং সর্বোপরি নানামুখি দিনযাপনের সরল রেখাচিত্র।
ধর্ষিত অবাধ পেক্ষাপটে/ নুয়ে পড়া হাহাকার/ বাতাসে লাশের
আর্তনাদে/ রানা প্লাজা তালায় তালায় ঘটনার ব্যাপক সংমিশ্রণে/ শহিদ দাদাবাবু
দিমিণিরা/ রয়ে গেছে প্রশ্ন/ হবে কবে বন্ধ মৃত্যু চাকা?’ (ফের একবার, পৃ. ৩৬); অথবা ‘পাঁচ
বছর অন্তর/ জাতীয় পতাকা খামছে ধরে/ তিনশটি চেনা অচেনা শকুন/ কোটি বাঙালির প্রেম
ভালোবাসা অস্তিত্ব/ করে যারা ধরাশায়ী/ গণতন্ত্রের পূজারি বাঙালি/ চাই একটু শান্তি/
জ্বেলে দিতে চাই নতুন প্রদীপ/ পথ প্রদর্শনের’ (শকুন, পৃ. ৪৩)। কবিতা ব্যক্তিমানুষের রক্তক্ষরণের এক
অনুপম রূপায়ণ। সমাজস্থ মানুষের আচরণ, চিন্তা, লোভ-জিঘাঙ্সা এবং প্রকৃতির বৈরী মনোভাব যে কবিহৃদয়কে পোড়ায়, বেদনায় লীন করে, উপরোক্ত কবিতার শরীরে তা সুচারুভাবে
প্রতিভাত হয়েছে।
কবি শামস মনোয়ারের কিছু কবিতায় ছন্দ, উপমা, চিত্রকল্পকে পাশ কাটিয়ে জীবন-সমাজের সরল বেদনা,
কিংবা অভিঘাত এবং দীর্ঘশ্বাস উঁকি দিয়েছে। কখনও সেসবই প্রধান হয়ে
ধরা দিয়েছে। যেমনÑ ‘তোমাদেরই রাস্তায় ঘুরে দেখি এক সোনালি
সূর্য/ হাতছানি দিয়ে বলে/ কী পেয়েছ এ সমাজে/ পেরেছ কি গাইতে সে গান/ সত্যের জয় ছিল
যেখানে/ বাংলাদেশ (বাংলাদেশ, পৃ. );
অথবা ‘হাজার কোটি বাঙালির হৃদয় আজ
কাঁদে/ রয়েছে তারা জীর্ণ কুটিরে/ দিয়েছে রক্ত শুধু মুক্তির নামে/ বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশ, পৃ. ১৫)।
তরুণ কবিদের আত্মপ্রকাশের ঊষাতে একটা ঘোর থাকে। এই
ঘোরের আরশিতে প্রথমেই প্রতিবিম্বিত হয় প্রিয়তমার মুখ। কবি শামস মনোয়ারের বেলায়ও
আমরা সেই ব্যাপারটি খুঁজে পাব। স্মৃতির কার্ণিশে কবিতাগ্রন্থের প্রথম কবিতায় আমরা
তেমনই প্রেমবিষয়ক আখ্যান দেখি উঠি ‘আমি তোমায়
ভালোবাসি না মোনালিসা/ যুগের সাক্ষী শিল্পের ছোঁয়া/ রয় অপূর্ণ আমারই ভুবন/ বড্ড
তৃষ্ণার্ত,/ কী মোহময় এই অপূর্ণতা ’ (মোনালিসা, পৃ. ৯)। কিন্তু এখানে প্রেম ছাড়াও প্রকৃতি,
মানুষ এবং সমাজের স্বরও উদ্ভাসিত হতে দেখি। তবে কখনো সেখানে কবিতার
নিয়ম-যুক্তি-প্রথার চেয়ে আবেগই প্রাধান্য লাভ করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, এই কবির উন্মেষের নান্দনিক অভিসার আমাদের প্রাণিত করে। আশা জাগায়, সম্ভাবনা তো বটেই।
স্মৃতির কার্ণিশে-য়ে কবির একটি সুচারু সুন্দর কবিতা ‘গ্রিলের
ফাঁকে’ কবিমনের দিনযাপনের শুভ্র কিংবা দ্বন্দ্বমুখর অভিঘাত কেমন, কিংবা কবির চোখে জগত ও প্রকৃতি কী অপরূপ মহিমায় মূর্ত হয়ে উঠেছে, এখানে তার অনুপম বিন্যাস দেখে উঠি ‘সন্ধ্যা
রাতে অবরুদ্ধ বিকেলে/ ইচ্ছে করে হেঁটে বেড়াতে/ জোছনা ভরা আকাশের চন্দ্রিমা/ মুক্ত
বাতাসে সুবাস ছড়িয়ে/ স্মৃতির অকপটে জোছনা ভরা/ সরল ছোঁয়ার বৃত্তের গোধূলিতে/ নতুন
সকালকে স্বাগত জানিয়ে/ ভোরের নীরবে বকুল কুড়িয়ে/ প্রজাপতির ডানায় নতুন পৃথিবীÑ ’ (গ্রিলের ফাঁকে, পৃ. ২৩)।
গদ্যের নিশ্চিত, বেগবান ও বিশ্লেষণী
ঢঙের রূপ পেয়েছে কোনও কোনও কবিতার শরীর। এক্ষেত্রে কীর্তি (পৃ. ২৭)-এর কথা বিশেষ
উল্লেখনীয়। কবিতার আদলে কবি যেন আমাদের বলে চলেন সরল জটিল কোনো গল্প। কিন্তু বিষম
খেয়ে উঠতে হয় কবিতার শেষে পোঁছে, যখন কবি বলে ওঠেন
... ‘আমি ভেবে ভেবে কাটাই সময়’।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবুর রহমান শুধু নেতাই ছিলেন না, জাতির সংবেদী কণ্ঠস্বরও ছিলেন সামগ্রিক অর্থেই। এমন সুপুরুষ ও বীরপুরুষের
জন্ম যুগে যুগে হয় না। এবং এই বোধ ও বিবেচনা সবার হয় না। কবি শামস মনোয়ারের কবিতায়
বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পাই, কবির নিজস্ব অনুভব ও দ্রোহের
প্রকাশে। কবির ভাষ্য ‘পায়
নি বিচার এ দেশে মুজিব/ দু-যুগ ধরে ধরে/ ফারুক, রশীদ নিয়ে গেছে/
জাতির জনক কেড়ে,/ খুন করে যদি শাস্তি না মেলে/ খুনিরা ঘোরে
আইনের বলে/ এই স্বপ্ন কি সেধেছিলে তুমি/ কৃতী বঙ্গ সন্তান/ ক্ষমা করবে না জাতি
এদের/ কথা দিচ্ছি,/ শেখ মুজিবুর রহমান’ ; (পিতা, পৃ. ১২)।
ছন্দ নির্বাচনে কবি শামস মনোয়ার মাত্রাবৃত্ত ও
অক্ষরবৃত্তের অনুরাগী বা অনুগামী হলেও কোথাও কোথাও ছন্দের ধার ধারেননি।
মুক্তছন্দের প্রতিই তার পক্ষপাতকে উজ্জ্বল করে তুলেছেন। কবিতাচর্চার প্রাথমিক
পর্বের প্রকাশ হিসেবে কিছু দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার প্রলেপ আমাদের ভ্রু কুচকে দিলেও
কবির শৈল্পিক উচ্চারণ, প্রয়াস এবং কবিতার চিত্তাকর্ষক ভাবের
ব্যঞ্জনা আমাদের মুগ্ধ করে। আশাবাদী করে তোলে। আর শেষ পর্যন্ত সৃজনমুখর কাজের কি
কোনো ব্যাখ্যা বা বিচার হয়, হতে পারে? কবি
শামস মনোয়ার চিন্তা-চেতনায় আধুনিক ও মগ্ন; নিয়ত ভ্রমণের
নেশায় ছুটে বেড়ান তিনি। ফলে তাঁর কবিতার ধ্যানে ও অন্তরীক্ষে ফুটে উঠেছে মানুষ,
জগৎ ও বঞ্চিতের হাহাকারও।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করা কবির কাজ নিপুণ শিল্পকুশলতার
মাধ্যমে,
শিল্পের পরিশীলিত সৌন্দর্যে; কিন্তু সরাসরি
প্রতিশোধ নেওয়া কোনো কবির কাজ নয়। কবিতায় শব্দ, ছন্দ,
উপমা এবং মোহনীয় বাক্যের
সমাহার ছাড়াও ‘অতিরিক্ত’ কিছু থাকতে হয় কী সেটা? অলৌকিক কিছু! হতে পারে,
অলৌকিক কোনো ভাবনা-বোধ ব্যঞ্জনাও থাকতে হয়। কেননা কবিতা তো
কেবলমাত্র স্বতোৎসারিত উচ্চারণ নয়, কবিতা এক শিল্প; তাই এর দক্ষ নির্মিতি প্রয়োজন। চেষ্টা-সাধনা-অভিনিবেশ এবং সংবেদী মন থাকলে
প্রাবন্ধিক হয়ে উঠতে পারা যেতে পারে, হয়তো গল্পকারও; কিন্তু কবি হয়ে ওঠা হয়তো সম্ভব নয়, কিছুতেই। কবিতা
প্রসঙ্গে একবার কবি জয় গোস্বামী বলেছিলেন ‘ভালো
কবিতা হলো দূর জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা
মেয়েটি,
যার মুখে রাস্তার আলো পড়ছে’।
ঢাকা শহরে এখন প্রেমিকজুগলের বসার জায়গা নেই, সুন্দর করে বসারও। মনভরে আড্ডা মারার অবকাশ নেই তেমন। কোথায় অবগাহন করবে
তারা? বসার জায়গা না পেলে হাগার জায়গাও তো থাকার কথা নয়।
কবিহৃদয় অত্যন্ত ব্যথিত হয়, আর্ত হয় যখন তিনি দেখেন আমাদের
প্রিয়তম কবি ও শিল্পীর শেষশয্যার পবিত্র জায়গাটুকু দখল হয়ে যায়, ভেসে যায় কতিপয় হৃদয়হীন মানুষের ত্যাগে প্রস্রাবের তোড়ে। কবি খুব
কষ্ট পান। কবির ভাষ্য ‘কী দোষ করেছিল জয়নুল/ প্রস্রাবের বন্যায় ভাসে/ তোমার শেষ চরণ/ গন্ধে মাতাল নজরুলের আত্মা/ কলুষিত করে
তাসের আড্ডা/ অশ্রাব্য ভাষা/ না খুব খারাপ লাগে/ হতে চাই না/ শেষ্ঠ শব্দের কর্মকার’ ; (গুণী শয়নের আঙিনা, পৃ. ৪১)।
এই কবিতার কোনো বিশ্লেষণ অপ্রকাশিত এবং অধরাই থাকুক।
কবিতা তো তাইÑ শব্দ ও বাক্যে
নির্মিত বাক্য বা পঙ্ক্তিই অর্থ ও ভাবের গভীর-গূঢ় দিকবিচারে বাক্যকে ছাড়িয়ে যায়,
ভাবনাকেও। কখনও বিষয়কেও। এবং তাতে বিশদ ও তীব্র তীক্ষ্ম
কথা-ব্যঞ্জনা-প্রতিবাদ ধারণ করে। তখন হয়তো ববিতায় ছন্দ উপমা উৎপেক্ষা গৌণ হয়ে ওঠে।
এমন কথার সাজুয্য ও সমর্থন পাব কবির ‘আসামি’ কবিতায়। জীবনের বহুকৌণিক অনুভব ও কথামালার অনুপম রূপায়ণ এই কবতিায় চিত্রিত
হয়েছে। ছন্দের ভারে নুব্জ নয়, গড়পড়তা সাধারণ কথার মতো
প্রসাদগুণহীনও নয়। কবির ভাষ্য
‘ডুবে আছি পাপে/ সরে আছি দূরে/ ফিরে আসব না আর/ বসে আছি
পুণ্যের সাথি আমার/ পথে পথে কত না খেলা/ বেদনায় নদী বয়ে চলে আঁকাবাঁকা/ সুর কেটে
যায় অচেনা বাসনার/ বাঁধি তাল পাল উড়িয়ে/ নাচি, হাসি, গাই/ করি নিশি রাত আলোকিত/ অচেনা জায়গায় ফেলি পায়ের ছাপ/ নিজেকে পূজা
দিবার ঠিক আগে’ (আসামি, পৃ. ৫৭)।
কবিতা জীবনের কোনো কাজে লাগে না, কবিতা কেবল স্বপ্ন দেখায়। আমাদের কবি আল মাহমুদ তো সেই কবেই বলে দিয়েছেনÑ
‘কবির কাজ মানুষকে স্বপ্ন দেখানো।’ তবে একটি ভালো কবিতার প্রথম বৈশিষ্ট্য হতে পারে পাঠানন্দ কবিতা হয়ে ওঠার
শর্ত ছন্দ-উপমা-উৎপেক্ষা-চিত্রকল্পের
সুনিপুণ ব্যবহার, পরিমিতিবোধ কিংবা ভাষার দ্যোতনা; এসবকে ছাপিয়ে কবিতাপাঠের সাধারণ ভালো লাগাটুকু চিহ্নিত হলে সেটিকে অন্তত
কিঞ্চিত সার্থক কবিতা হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়, অনায়াসে। কারণ
কবিতার প্রথম কাজই পাঠকমনে আলোড়ন তোলা। প্রথম পাঠেই যে কবিতা পাঠকহৃদয়ে পৌঁছুতে
ব্যর্থ হয় তা আড়ালে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কবিমাত্রই সৃজনশীলতার উৎকর্ষে
পাঠকমনে দোলা দেন, সন্তর্পণে।
তিনি, কবি শামস মনোয়ার মনন ও সৃজনশীলতার
অবাক অভীপ্সায় নিয়ত আকুল থাকেন, থাকতে হয়। তাঁর কবিতার
জানালায় মনোনিবেশ করলে কবিহৃদয়ের উত্তাপ টের পাওয়া যায়। সেখানে নানা রঙ ও অনুভবের
খেলা চলে। নিজের সহজাত জ্ঞান ও মেধার সৌরভে তিনি অনুভবের জগত এবং সময়কে ধারণ করেন।
অতিক্রম করে চলেন নিজেকেও। এবং একজন কবি সৃজনমুখর মানুষের প্রচেষ্টা সে পথেই।
কবি শামস মনোয়ারের কবিতাগ্রন্থ স্মৃতির কার্ণিশে-র বহুল
পাঠ ও প্রচার কামনা করি। তাঁর কবিতামগ্ন হৃদয়ের সুস্থ্যতা ও সমৃদ্ধি এবং কবির
সৃজনমুখর অভীপ্সার দীর্ঘায়ু প্রত্যাশা করি।
::
শামস মনোয়ার । স্মৃতির কার্ণিশে
প্রকাশক : আগামী প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৪, প্রচ্ছদ : শিবু
কুমার শীল, পৃষ্ঠা : ৬৪, মূল্য : ১২৫
টাকা।
No comments:
Post a Comment